ঢাকা, বুধবার   ১২ আগস্ট ২০২৬

মারা গেছেন চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি 

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৯:০১, ১২ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১৯:৩৫, ১২ আগস্ট ২০২৬

মারা গেছেন চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি 

মারা গেছেন চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি 

Ekushey Television Ltd.

চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির অভাবনীয় অর্থনৈতিক উত্থানের অন্যতম রূপকার ঝু রংজি মারা গেছেন।

বুধবার (১২ আগস্ট) বেইজিংয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ৯৭ বছর বয়সী এই রাজনীতিক। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ঝু রংজি। চীনের অর্থনীতিকে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত কাঠামো থেকে আরও বাজারমুখী ও বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানিয়েছেন, দুর্নীতি দমন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, আর্থিক ও করব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের মত বড় সংস্কারের সঙ্গেও তার নাম জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের যোগদানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান নীতিনির্ধারক। দীর্ঘ আলোচনার পর ডব্লিউটিওতে প্রবেশের মাধ্যমে চীনা অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাজার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য আরও উন্মুক্ত হয়। তার আমলেই চীনে দারিদ্র্য বিমোচন, মধ্যবিত্ত শ্রেণির ব্যাপক বিকাশ এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য বাজার উন্মুক্ত করার মতো ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

ঝু রংজিকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রায়ই চীনের ইকোনমিক জার হিসেবে বর্ণনা করা হত। ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকেই তিনি দেশের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন—প্রথমে উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে, পরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।

সে সময় চীনের অর্থনীতি দ্রুত বাড়লেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তে থাকা ঋণ এবং লোকসানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল। ঝু আর্থিক নীতি আরও কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং অদক্ষ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা বেসরকারিকরণের মাধ্যমে এসব সমস্যা মোকাবিলার উদ্যোগ নেন।

তবে এসব সংস্কারের সামাজিক মূল্যও ছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের ফলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক চাকরি হারান। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এ সংখ্যা কয়েক কোটি পর্যন্ত বলা হয়। তবে ঝু ছাঁটাই হওয়া ও বেকার শ্রমিকদের পুনর্বাসন এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপরও জোর দিয়েছিলেন। চীনের আর্থিক ব্যবস্থাতেও তিনি বড় পরিবর্তন আনেন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেন।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঝুর সময়ে চীন প্রায় ২৭ শতাংশের উচ্চতায় পৌঁছানো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় এবং মুদ্রাব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট লিখেছে, ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকট সামলাতেও ঝু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সে সময় আঞ্চলিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতার মধ্যেও চীনের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সরকার সক্রিয় রাজস্ব ও মুদ্রানীতি গ্রহণ করে।

চীনের সরকারি শোকবার্তায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল রাখায় ঝুর ভূমিকার কথা বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়েছে। একই বছর হংকংয়ের ব্রিটিশ শাসন থেকে চীনের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়াতেও ঝু ভূমিকা রাখেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঝুর সবচেয়ে বেশি আলোচিত সাফল্যের একটি ছিল ডব্লিউটিওতে চীনের প্রবেশ। চীনকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে ১৫ বছর ধরে আলোচনা চলার পর ২০০১ সালে দেশটি ডব্লিউটিওর সদস্য হয়। ঝু ওই আলোচনায় নেতৃত্ব দেন এবং দেশের অভ্যন্তরে সংস্কারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল লিখেছে, তার ওই উদ্যোগ দেশীয় রাজনীতিতে বিতর্কও তৈরি করেছিল। সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করতেন, ডব্লিউটিওতে প্রবেশের জন্য চীন অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছে। তবে পরে চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে দ্রুত বিস্তারের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে দেখা হয়।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ও আপসহীন সংস্কার নীতির জন্য ঝু একই সঙ্গে প্রশংসা ও সমালোচনা পেয়েছেন।  তার স্পষ্টভাষী বক্তব্য এবং কখনও সরস, কখনও উত্তেজক বক্তৃতার ধরনও তাকে চীনের অন্য অনেক নেতার তুলনায় আলাদা পরিচিতি দেয়।

১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, সামনে মাইনফিল্ড বা গভীর খাদ থাকলেও তিনি দ্বিধা না করে এগিয়ে যাবেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিজের কাজ করে যাবেন। তার ওই বক্তব্য পরে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।

সাউথ চায়না মরনিং পোস্ট লিখেছে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশিত শোকবার্তায় ঝুকে দল ও রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা ব্যক্তি হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।

শোকবার্তায় বলা হয়েছে, তিনি দেশের পরিকল্পিত অর্থনীতি থেকে সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতিতে রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯২৮ সালে মধ্য চীনের হুনান প্রদেশের রাজধানী চাংশায় ঝু রংজির জন্ম। ১৯৫১ সালে তিনি বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি পান।

এরপর রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা সংস্থায় কাজ শুরু করেন। মাও জেদংয়ের আমলের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তার কর্মজীবনও বাধাগ্রস্ত হয়।  ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে সরকারের অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনার কারণে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হন এবং পরে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় আবারও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হন।

মাওয়ের মৃত্যুর পর ঝু পুনর্বাসিত হন এবং আবার পার্টিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান। ১৯৮৮ সালে তিনি সাংহাইয়ের মেয়র হন। সেখানে তার কাজ তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা দেং শিয়াওপিংয়ের নজরে আসে।

১৯৯১ সালে তাকে উপপ্রধানমন্ত্রী করা হয় এবং দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। সাত বছর পর, ১৯৯৮ সালে, তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৩ সালের মার্চে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অবসর নেন ঝু। এরপরও হু জিনতাও ও শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি তিনি সমর্থন অব্যাহত রেখেছিলেন।

সাউথ চায়না মর্নিং পোাস্ট লিখেছে, ঝু রংজির নেতৃত্বে নেওয়া সংস্কারগুলো পরবর্তী দুই দশকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীনের আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের ইতিহাসে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাল।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ঝু রংজি ছিলেন অত্যন্ত সমাদৃত। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার একটি বইয়ের মুখবন্ধে ঝু রংজিকে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি